বর্তমান চলচ্চিত্র শিল্পের গ্রহনযোগ্যতা

শনিবার ২ অক্টোবর ২০২১ ২১:৫৫


মানুষ সামাজিক জীব৷ বেঁচে থাকার জন্য মানুষকে বহুমুখী চাহিদা পূরণ করতে হয়৷ খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, বাসস্থান ও শিক্ষার পাশাপাশি চিত্তবিনোদনও মৌলিক মানবিক চাহিদার একটি উপাদান। তথ্য প্রযুক্তির আধুনিক বিশ্বে চিত্তবিনোদনের অনেক মাধ্যম রয়েছে তবে অন্যতম মাধ্যম হলো চলচ্চিত্র৷ চলচ্চিত্র যেমন একদিকে শিল্প অন্যদিকে সুষ্ঠু সামাজীকিকরণের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। গঠনমূলক চিত্তবিনোদনের অভাব ও দেশীয় সংস্কৃতির সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ নির্মিত চলচ্চিত্রের কারনে প্রতিদিনই যুব অসন্তোষ, কিশোর অপরাধ, মূল্যবোধের অবক্ষয়, নৈতিক শিথিলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে৷ 


বাংলাদেশে সর্বপ্রথম চলচ্চিত্র প্রদর্শনী হয় ১৮৯০ সনে৷ এরই সূত্র ধরে এই অঞ্চলে ১৯০০-এর দশকে নির্বাক এবং ১৯৫০-এর দশকে সবাক চলচ্চিত্র নির্মাণ ও প্রদর্শন শুরু হয়। চলচ্চিত্রের উৎপত্তি ১৯১০-এর দশকে হলেও এখানে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নিয়ে আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে ১৯৫০-এর দশকেই। 

১৮৯৮ সালের ৪ এপ্রিল দেশে সর্বপ্রথম বায়োস্কপ প্রদর্শনী হয়৷ এই বায়স্কোপের ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন অংশের আধুনিক সংস্করণ আজকের চলচ্চিত্র শিল্প৷ ঢাকার জগন্নাথ কলের বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ভিক্টোরিয়া পার্ক বর্তমান বাহাদুর শাহ পার্ক, আহসান মঞ্জিল এবং ঢাকার বাইরে তৎকালীন মানিকগঞ্জ মহকুমার বগজুরি গ্রামে, জয়দেবপুরে ভাওয়াল এস্টেটের রাজপ্রাসাদে , ফরিদপুর জেলার মাদারীপুর মহকুমার পালং-এ বায়োস্কোপ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। 

গবেষক অনুপম হায়াতের অনুসন্ধান থেকে জানা যায়, এই সব চলচ্চিত্রের মধ্যে ছিল মহারানী ভিক্টোরিয়ার জুবিলি মিছিল, গ্রিস ও তুরস্কের যুদ্ধ, তিনশত ফুট উঁচু থেকে প্রিন্সেস ডায়ানার লাফ, রাশিয়ার সম্রাট জারের অভিষেক, পাগলা নাপিতের ক্ষৌরকর্ম, সিংহ ও মাহুতের খেলা, ইংল্যান্ডের তুষারপাতে ক্রীড়া, ফ্রান্সের রাস্তাঘাট ও পাতাল রেলপথ ইত্যাদি৷ এখানে একটি বিষয় উল্লেখ্য যে, তৎকালীন সময় অর্থাৎ ব্রিটিশ রাজত্বের সময় যেসব চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছিলো তার মধ্যে তাদের ইতিহাস ঐতিহ্যের একটা স্পষ্ট ছাপ দেখা যায়৷ 

বিশ শতকের গোড়ার দিকে চলচ্চিত্র শিল্পের বিকাশ হলেও পঞ্চাশের দশকে সবাক চলচ্চিত্রের নির্মান ও প্রদর্শন শুরু হয়৷ বিশ্লেষকদের মতে এখানকার সাংস্কৃতিক পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতেই চলচ্চিত্রের প্রায় ৫০ বছর লেগে গেছে৷ ১৯৯০-এর দশকে বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ৮০টির মত পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র মুক্তি পেত। আর ২০০৪ সালের হিসাব মতে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাতে বছরে গড়ে প্রায় ১০০টির মত চলচ্চিত্র মুক্তি পায়। এ হিসেবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পকে বেশ বড়ই বলা যায়, যদিও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র শিল্পে তা অনেকটাই উপেক্ষিত৷ 

১৯২৭-২৮ সালে বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ক্রীড়া শিক্ষক অম্বুজপ্রসন্ন গুপ্তের পরিচালনায় নওয়াব পরিবারের কয়েকজন তরুন সংস্কৃতিসেবী নির্মান করেন পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র "দ্যা লাস্ট কিস"৷ ১৯৩১ সালে এই চলচ্চিত্র ঢাকার মুকুল হলে প্রদর্শিত হয়। এ প্রদর্শনীর উদ্ভোদন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বিখ্যাত ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার। এর পর থেকে নির্মিত হয় মুখ ও মুখোশের মতো চলচ্চিত্রগুলি।

১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল তৎকালীন প্রাদেশিক শিল্পমন্ত্রী  পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ইস্ট পাকিস্তান ফিল্প ডেভলপমেন্ট কর্পোরেশন (EPDF) প্রতিষ্ঠা করেন যা স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ফিল্প ডেভলপমেন্ট কর্পোরেশন (BFDC) নামে পরিচিতি লাভ করে । বাংলাদেশের চলচ্চিত্র তৈরিতে ১৯৫৯ থেকে অদ্যাবধি প্রতিষ্ঠানটি বিশেষ অবদান রেখে চলেছে।

সমাজ-সংস্কৃতীর উন্নয়নের পাশাপাশি জাতির ইতিহাস ঐতিহ্যকে সমুন্নত রাখতে চলচ্চিত্র শিল্পের যে অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছিলো তা এখন অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে পড়েছে।

সাধারণত নাটক, উপন্যাস, গল্পের মতো চলচ্চিত্রও নির্মিত হয় দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সামাজিক সমস্যাগুলোর উপর ভিত্তি করে। সর্বপ্রথম সবাক চলচ্চিত্র " মুখ ও মুখোশ" এর মৌলিক বিষয় বস্তুর দিকে লক্ষ করলে তা স্পষ্ট হয়ে উঠে৷ বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি এ অঞ্চলে ডাকাতি ও দস্যুবৃত্তি অনেক বেড়ে যায় বস্তুত এরই উপর নির্মিত হয় এ চলচ্চিত্রটি৷ পরবর্তিতে জীবন থেকে নেয়া, হাজার বছর ধরে, স্টপ জেনোসাইড, ধীরে বহ মেঘনা, আলোর মিছিল, সংগ্রাম, ওরা ১১ জন, মাটির ময়না সহ বিংশ শতাব্দীর শেষ ও একবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে যেসব চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে বিচার বিশ্লেষণে দেখা যায় মহান মুক্তিযুদ্ধ, গ্রাম বাংলার সারল্য, শহুরে জীবনের নানান সমস্যা ইত্যাদি খুব নিখুঁতভাবে উঠে এসেছে পরিচালক ও শিল্পীদের মাধ্যমে।

বিগত দশকে নির্মিত চলচ্চিত্রগুলিতে বিজাতীয় সংস্কৃতির অবাধ  চর্চা, বানিজ্যিক প্রতিযোগিতা, যৌথ প্রযোজনা, দূর্নীতি  সহ নানান কারনে চলচিত্র শিল্পে যে ধ্বস নেমেছে তা সত্যিই দুঃখজনক৷ উন্নত সংস্কৃতির নামে নোংরা পোশাক-পরিচ্ছদ, নিচু রুচিশীলতা, বিদেশী শিল্পীদের অন্ধ অনুকরণের কারনে শিল্পী ও পরিচালকদের সাথে জনসাধারণের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। সংস্কৃতি সেবার পরিবর্তে শিল্পীরা বানিজ্যিক প্রতিযোগিতায় নেমেছে।  এককালের জমজমাট সিনেমা হলগুলোও এখন ভেঙ্গে শপিং কমপ্লেক্স তৈরি করা হচ্ছে। 

চলচ্চিত্র শিল্পকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে রক্ষা করতে প্রবীণ পরিচালক, প্রযোজক, শিল্পীদের এগিয়ে আসতে হবে৷ বিজাতীয় সংস্কৃতির পরিবর্তে নিজস্ব সংস্কৃতির চর্চা করতে হবে৷ পাশাপাশি ইতিহাস ঐতিহ্যের উপর ভিত্তি করে যুগোপযোগী চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে হবে৷ তবেই চলচ্চিত্র শিল্পের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধিপাবে। বানিজ্যিক সফলার পাশাপাশি সামাজীক অবক্ষয় রোধেও সহায়ক হবে ও শিল্প।

লেখকঃ রাকিবুল ইসলাম (রাকিব)
শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি

এমএসি/আরএইচ

সর্বশেষ

চট্টগ্রামে যাত্রা শুরু হল লায়ন্স আই ইনস্টিটিউটের

চট্টগ্রামে যাত্রা শুরু হল লায়ন্স আই ইনস্টিটিউটের

বাউফলে সাংবাদিককে প্রাণনাশের হুমকি; অডিও ভাইরাল

বাউফলে সাংবাদিককে প্রাণনাশের হুমকি; অডিও ভাইরাল

চুনারুঘাটে ৪ কোটি ৩২ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ২ টি ব্রিজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন বিমান প্রতিমন্ত্রী

চুনারুঘাটে ৪ কোটি ৩২ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ২ টি ব্রিজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন বিমান প্রতিমন্ত্রী

জেসিআই ঢাকা ইয়াংয়ের নতুন কার্যনির্বাহী কমিটি ঘোষণা

জেসিআই ঢাকা ইয়াংয়ের নতুন কার্যনির্বাহী কমিটি ঘোষণা

ঝিনাইদহ জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যানের গাড়িচালককে গুলি

ঝিনাইদহ জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যানের গাড়িচালককে গুলি

চট্টগ্রামে প্রধানমন্ত্রীর জনসভা আজ

চট্টগ্রামে প্রধানমন্ত্রীর জনসভা আজ

কেরাণীগঞ্জে বাকপ্রতিবন্ধীকে ধর্ষণের পর পুড়িয়ে হত্যা মামলার আসামি গ্রেফতার

কেরাণীগঞ্জে বাকপ্রতিবন্ধীকে ধর্ষণের পর পুড়িয়ে হত্যা মামলার আসামি গ্রেফতার

নোয়াখালীতে ১হাজার ইয়াবা সহ গ্রেফতার ৩

নোয়াখালীতে ১হাজার ইয়াবা সহ গ্রেফতার ৩

সেনবাগ উপজেলা আ.লীগের সভাপতি মোরশেদ, সাধারণ সম্পাদক মানিক

সেনবাগ উপজেলা আ.লীগের সভাপতি মোরশেদ, সাধারণ সম্পাদক মানিক

বড়লেখায় শ্রমিক পরিবারের অসুস্থ রোগীকে নিসচার আর্থিক অনুদান প্রদান

বড়লেখায় শ্রমিক পরিবারের অসুস্থ রোগীকে নিসচার আর্থিক অনুদান প্রদান